আমরা কেন কৃতজ্ঞ হই না

[এটি নওমান আলি খানের লেকচারেরবাংলা অনুবাদ]

ইনশাআল্লাহ আজকে আমি কুরআনের ১৪ নম্বর সুরা সম্পর্কে আলোচনা করব। এটি হল সুরা ইব্রাহিম। কুরআনে যে জাতি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি বলা আছে, যা থেকে মুসলমানরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে তারা হল মুসা (আ) এবং তার জাতি বনী ইসরাইল। ৭৫ ভাগের বেশি আয়াত মুসা (আ) এবং তার জাতির কথা। তাদের কথা কিন্তু বলা হয়নি নবী (সা) মদিনাতে হিজরত করার পরে, কারণ এই সুরাটি একটি মাক্কি সুরা। মুসা (আ) এবং তার জাতির উদাহরন দেওয়া হয়েছে একদম প্রথম দিকের মুসলমানদেরকে। এমনকি তাদের কথা আমাদের নবী (সা) এর জন্যও উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে, যা থেকে তিনি নিজেও শিক্ষা নিয়েছেন। এই সুরাটি শুরু হয়েছে-

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ

“এটি একটি অসাধারন গ্রন্থ, যা আমি আপনার (মানে নবী(সা) এর) প্রতি নাযিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। তারা বিভিন্ন গভীরতার অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে, তাদেরকে তা থেকে বের করে আনা হচ্ছে আপনার দায়িত্ব। এই হল আপনার কাজ”।

এর কিছু আয়াত পরে আরও বলা হয়েছে যে মুসা (আ) কেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَىٰ بِآيَاتِنَا

“আমি মূসাকে নিদর্শনাবলী সহ প্রেরণ করেছিলাম”

أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ

“যাতে করে আপনি আপনার জাতিকে বিভিন্ন গভীরতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন”।

সুতরাং নবী (সা) কে শুরুতেই আল্লাহ বলছেন যে মুসা (আ) কেও ঠিক একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল – তাই আপনি দেখুন সে তার জাতিকে কি বলেছিল। আপনি কেননা সেদিকে মন দেন যাতে করে আপনি শিখতে পারেন আপনি আপনার জাতিকে কি বলবেন। এভাবেই আল্লাহ আমাদেরকে এবং তার শেষ নবীকে (সা) শেখাচ্ছেন।

যাহোক, কুরআনে বনী ইসরাইলিদের অনেক ধরনের গল্প রয়েছে। কুরআনে আমরা বনী ইসরাইলিদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। মুসা (আ) এবং ফেরাউনের কথা, মুসা এবং তার অনুসারীদের কথা, তারা পালাবার আগের এবং পরের ঘটনাগুলো – এরকম কতগুল অসাধারণ ঘটনা, কত এডভেঞ্চারের কথা আছে। কতনা ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু কোন ঘটনাটি আল্লাহ এখানে উল্লেখ করতে যাচ্ছেন যখন তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে আনার জন্য বলছেন? কোন ব্যপারটিতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিবেন এখন? আমি এটা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করছি কারণ সকল মুসলমানের উচিত সবসময় চিন্তা করা কিভাবে সে নিজেকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসবে। আল্লাহ কিন্তু বলেননি শুধু ‘অন্ধকার’ বরং তিনি বলেছে ‘বিভিন্ন গভীরতার অন্ধকার’। যেমন অন্ধকার বা ছায়া খুব ঘন হতে পারে আবার খুব হাল্কা অন্ধকার হতে পারে। মুসলমানরা কিন্তু সম্পূর্ণ ভালো বা সৎ নয়, যে হয় আমরা একদম সঠিক পথ প্রাপ্ত, নাহয় একদম পথভ্রষ্ট। বরং আমরা বিভিন্ন গভীরতার অন্ধকারের মধ্যে আছি এবং আমাদের সবসময় চেষ্টা করতে হবে নিজেদেরকে তা থেকে বের করে আনার। আর একটি অন্যতম এবং ভয়ংকর ধরনের অন্ধকারের কথা সামনের আয়াতগুলোতে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হবে। তাহলে চলুন দেখি মুসা (আ) তার জাতিকে কি বলতে যাচ্ছেন।

وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

আমি যখন এই আয়াতগুলো অনুবাদ করছি, আপনি মনে রাখবেন যে এগুলো হচ্ছে মুসা (আ) তার জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য বলছেন।

প্রথম তিনি যা বলছেন তা হলঃ

আল্লাহ তোমাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ কর।

নিজেদেরকে মনে করাও আল্লাহ তোমাদেরকে যে অনুগ্রহগুলো করেছেন।

আপনারা জানেন এই আয়াতগুলো যখন প্রকাশ করা হয়েছিল তখন বনী ইসরাইলিরা কিন্তু বেশি ভালো অবস্থায় ছিল না। এমন না যে তারা অনেক সফল জাতি ছিল, বিশেষ করে মুসা (আ) এর জীবনকালে। হয় তারা এমন অবস্থায় ছিল যে তারা এক অত্যাচারী শাসকের অধীনে ছিল যে কিনা শিশু হত্যা করছিল, একজন দুজন নয়, বরং হাজারে হাজারে, অথবা তারা ছিল কোন মরুভুমিতে যেখানে তাদের পানির পিপাসায় মারা যাবার মত অবস্থা। কিন্তু তারপরেও কিন্তু তাদেরকে প্রথমে ‘তোমরা ধৈর্য ধর’ বলা হচ্ছে না, বরং তাদেরকে প্রথম যা বলা হচ্ছে তা হল ‘আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর’। কি কি খারাপ যাচ্ছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং তোমরা কেন চিন্তা করনা কি কি ভালো হচ্ছে? তোমরা কি কি জিনিস উপভোগ করছ? আমি এখানে আপনাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তারা যখন বিশাল নদী অতিক্রম করেছিল, যখন কিনা তাদের মারা যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না, আল্লাহ তখন তাদেরকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তারা নদী অতিক্রম করেছিল। আল্লাহ তাদেরকে মরুভুমিতে পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মোট কথা আল্লাহ তাদেরকে এমন সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন যেগুলো ছাড়া তাদের বেঁচে থাকার কোনই উপায় ছিল না। মরুভুমিতে কেউ বেঁচে থাকতে পারেনা বিশেষ করে সেই বিশাল জনসংখ্যা নিয়ে, পুরুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কোথাও কোন আশ্রয় নেই। আল্লাহ তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলেন মেঘ দিয়ে। তিনি তাদেরকে বৃষ্টি দিয়েছিলেন। তিনি মান্না এবং সালওয়া দিয়েছিলেন যা কিনা আমরা সবাই ছোট বেলায় গল্পে পড়েছি। তিনি তাদেরকে খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ১২টি জলধারা দিয়ে। তাদের খাবার, আশ্রয়, পানি সবকিছুর ব্যবস্থাই করে দিয়েছিলেন এক অসম্ভব অবস্থার মধ্যে। কিন্তু এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে। আমি সেটা উল্লেখ করে আবার এই সুরায় ফিরে আসবো।

কিছু সময় পরে তারা সেই খাবারের উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। তারা ঘুরে বেরাচ্ছে এবং জিগ্যেস করছে –

  • দুপুরের মেনু কি?
  • মান্না এবং সালওয়া।
  • রাতের মেনু কি?
  • উমম…, সালওয়া এবং মান্না মনে হয়।

খুব একটা বৈচিত্র্য নেই মেনুতে।

আপনারা ঘটনাটা কল্পনা করেন – কিছু লোক বসে বসে গল্প করছে আর বলছে, ভাই, সেই রেস্টুরেন্টের কথা মনে আছে? ওই মিশরের রেস্টুরেন্টটা কিন্তু বেশ ভালোই ছিল। তারা বসে বসে কিছু সবজির কথা বলাবলি করছে। তারপর তারা মুসা(আ) এর কাছে গেল এবং কুরআন তাদের কথোপকথনটা রেকর্ড করেছেঃ

فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ مِن بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا

“তারা মুসা(আ) এর কাছে গেল এবং তাদের কেউ কেউ বলল, আপনি কেননা আপনার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন যেন তিনি আমাদেরকে কিছু তরকারি, শশা, রসুন, পিঁয়াজ পাঠান” –

আর কিছু বার্গার এবং ফ্রাই হলেও ভালো হয় – একদম পুরো মেনু! এখন প্রশ্ন আসে কখন তারা এই খাবারগুলোর নাম শিখেছে? এমন না যে তারা এগুলোর নাম শিখেছে মরুভুমিতে এসে। তারা এগুলোর নাম শিখেছে যখন তারা মিশরে ফেরাউনের অত্যাচারে ছিল! তো আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন, কেউ যদি জেল থেকে বের হয়ে, জেলের খাবারটা কতই না ভালো ছিল বলে, সে যদি জেলের খাবারের জন্য আফসোস করে, তার মানে দাঁড়ায় সে জেলের জন্য আফসোস করছে। সে স্বাধীনতার স্বাদ উপলব্ধি করছে না, স্বাধীনতার যথার্থ মূল্যায়ন করছে না।

আপনি কি খাবার খেতে পাচ্ছেন না, তা নিয়ে সারাদিন আফসোস করতে পারেন, অথবা আপনি এখন কত খাবার খেতে পাচ্ছেন তা নিয়ে কৃতজ্ঞ হতে পারেন।

এই ঘটনায় মুসা(আ) খুবই অসন্তুষ্ট এবং তিনি বলছেনঃ

قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَىٰ بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ

“তোমরা কি তোমাদের জন্য যা ভালো তাকে, যা অপেক্ষাকৃত কম ভালো, তা দিয়ে বদল করতে চাও?”

তিনি কিন্তু শুধু খাবারের কথা বলছেন না, তিনি তাদের স্বাধীনতার কথা বলছেন। তিনি বলছেন, তোমাদের সমস্যাগুলোর মধ্যে থেকেও তোমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে তোমরা কি কি সুবিধা পাচ্ছো।

আজকাল মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কি ধরনের গল্প করতে দেখা যায়? আমাদের সমস্যা গুলো কি কি? ভাই, আজকালকার তরুণদের কত সমস্যা। ভাই, রাজনীতি। ভাই, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাস্মির। ভাই, আমাদের মসজিদে অনেক ঝামেলা। ভাই, এই লোকের অনেক দোষ, ওই কমিটির অনেক সমস্যা, এই সংগঠনের এই সমস্যা, আমাদের মুসলিম সংগঠনে সেই সমস্যা। আমরা সারাদিন একই জিনিস নিয়ে কথা বলি – সমস্যা। সারাদিন এটাই করি আমরা, এটা আমাদের কাছে একটা বিনোদন। আপনাদের অনেকেই এমন পরিবারে বড় হয়েছেন যেখানে আপনাদের বাবা অনেককে চায়ের দাওয়াত দিয়ে এনে সারা পৃথিবীর সমস্যা নিয়ে গল্প করবে। এটাই তাদের সংস্কৃতি – এর মধ্যে এই সমস্যা, ওর মধ্যে ওই সমস্যা, এটার এই খারাপ, ওটার ওই খারাপ – আগামী সপ্তাহে আবার দেখা হবে, আর আমরা একই সমস্যাগুলো নিয়ে আবার আলোচনা করব। ঠিক না?

আল্লাহ ইসরাইলিদেরকে বলছেন, তোমাদেরকে প্রথম যে দিকে মনোযোগ দিতে হবে তা হল আল্লাহর অনুগ্রহগুলো – اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

তারপর তিনি বলছেন, তোমরা যদি কিছু মনে করতে না পার তাহলে আমি তোমাদেরকে মনে করিয়ে দেই,

إِذْ أَنجَاكُم مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ

“যখন তিনি তোমাদেরকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন”।

يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ

“যে তোমাদেরকে কঠিনতম শাস্তি দিত”।

وَيُذَبِّحُونَ أَبْنَاءَكُمْ

“সে তোমাদের ছেলে সন্তানদেরকে হত্যা করত”।

وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ

“এবং সে তোমাদেরকে নারীদেরকে বাঁচিয়ে রাখত, যাতে করে তোমাদেরকে সে আরও অপমান করতে পারে”।

وَفِي ذَٰلِكُم بَلَاءٌ مِّن رَّبِّكُمْ عَظِيمٌ

“আর এসব কিছুর মধ্যে তোমাদের জন্য ছিল এক কঠিন পরীক্ষা”।

এখন এই কথপকথনটা হচ্ছে যখন তারা এসবকিছু থেকে মুক্তি পেয়েছিল। আল্লাহর নবী তাদেরকে বলছেন যে তোমাদের প্রথম সমস্যা হচ্ছে তোমরা কৃতজ্ঞ নও। তোমরা সবসময় তোমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তা কর, তোমরা কখনও তোমাদের জীবনের ভালো দিকগুলো নিয়ে ভাবো না।

আমি আপনাদেরকে মুসলিম পরিবারের দুরবস্থার কথা নিয়ে কিছু বলি। কত শাশুড়ি আছে যারা সারাদিন শুধুই কমপ্লেইন করে, কত স্ত্রী আছে যারা সারাদিন কমপ্লেইন করে, কত স্বামী আছে যারা সারাদিন কমপ্লেইন করে। কত ছেলে মেয়েরা আছে সারাক্ষণ কমপ্লেইন করে। তুমি আমাকে এইটা দাওনা, ওইটা দাওনা। আমি কখনও এটা করতে পারিনা, ওটা করতে দাওনা। তুমি কেন ওই চাকরিটা নিলে, কেন ওই দেশে চলে গেলে। সবসময় একে অন্যকে নিয়ে কমপ্লেইন। এই আমাদের জীবন হয়ে গেছে। লোকজন যখন বাসায় বেড়াতে যায় তখন স্বামী স্ত্রী নিয়ে কমপ্লেইন করে, স্ত্রী স্বামীকে নিয়ে কমপ্লেইন করে। শ্বশুর শাশুড়িরা একে অন্যকে নিয়ে কমপ্লেইন করছে। এই চলছে সারাদিন। এই আমাদের জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একারনে আপনাদের অনেকেই মসজিদে অনেক সময় কাটান, বাসায় টিকতেই পারেন না।

এটা শুধু আমাদের ধর্মের জন্যই নয়, বরং আমাদের জীবনের সবকিছুতেই আমাদেরকে ভালো, পজিটিভ দিকগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ আপনি যখন তা করবেন না, তখন কি হবে জানেন? আর এটা শুধু কোন ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং আপনি যখন জীবনের ভালো দিকগুলোতে মনোযোগ না দেন, আপনি একটা দুর্ভাগা জীবন পার করেন। আপনি একটা বিষণ্ণ জীবন পার করেন। কোন কিছুই আপনাকে খুশি করতে পারেনা, কারণ আপনি জীবনে যা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে তা নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকেন।

আপনি চিন্তা করে দেখেন, ইসরাইলিরা যার মধ্যে দিয়ে গেছে তা কিন্তু কোন সহজ ঘটনা নয়। আপনি যখন কোন খবর পড়েন যে একটা শিশু মারা গেছে, হয়ত কোন গাড়ি দুর্ঘটনায় – আপনি যথেষ্ট খারাপ লাগে। সেখানে এই লোকটা হাজারে হাজারে শিশু হত্যা করছে, সজ্ঞানে। এটা যে কোন জাতির জন্য একটা ভয়াবহ ঘটনা। যদিও তারা তা থেকে পালিয়ে বেঁচেছে, কিন্তু সেই ভয়াবহ ঘটনার ছাপ কিন্তু তাদের মন থেকে চলে যায়নি। কিন্তু তারপরেও আল্লাহ বলছেন যে আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি মনোযোগ দাও, এটা বোঝার চেষ্টা কর যে তা অতীত হয়ে গেছে, সেটা শেষ, এখন তোমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাদের মনের অবস্থার পরিবর্তন করতে বলা হচ্ছে। তাদের আর কমপ্লেইন করার কোন কারণ নেই।

তারপর মুসা (আ) বললেন,

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ

খুবই বিখ্যাত আয়াত। এই আয়াতটাকে প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে উদাহরণ দেওয়া হয়। আমি আপনাদেরকে একটা মোটামুটি অনুবাদ বলছি।

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

“যখন তোমাদের প্রভু ঘোষণা করলেন, তুমি যদি কৃতজ্ঞ হও, আমি তোমাদের জন্য বহুগুনে বাড়িয়ে দিব”।

وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

“আর যদি তুমি অকৃতজ্ঞ হও, অস্বীকার কর, তাহলে আমার শাস্তি হবে কঠিন”।

কিন্তু চলুন আমরা আরেকটা ব্যপার নিয়ে আগে কথা বলি।

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ

আমাদের অনেক আলেম বলেন তাদের তাফসিরে যে এটা হবে,

واذْكُرُوا وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ

“নিজেদেরকে মনে করিয়ে দাও হে ইসরাইলিরা, মুসা(আ) এর অনুসারিরা, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন”।

আপনারা জানেন যে একটা ঘটনা আছে, একসময় মুসা (আ) বনী ইসরাইলের নেতাদেরকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাওবা করার জন্য, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। আল্লাহ তাদেরকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। আর তিনি যখন তাদেরকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, তিনি তাদেরকে অনেক কিছু বলেছিলেনঃ

خُذُوا مَا آتَيْنَاكُم بِقُوَّةٍ

অত্যন্ত দৃঢ় ভাবে ধর আমি যা তোমাদেরকে দিয়েছি।

তাদেরকে খুব কঠিন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল – বইটা দৃঢ় ভাবে ধর। এই আয়াতে আল্লাহ উল্লেখ করছেন যে তাদেরকে আরেকটা জিনিসও বলা হয়েছিল। আর এর সবকিছুই হচ্ছে কৃতজ্ঞ হবার জন্য। ইসরাইলিদেরকে আবারও ডাকা হচ্ছে এবং তাদেরকে শুধুই যে জিনিসটা বলা হচ্ছে তা হল – কৃতজ্ঞ হও।

তার আগে আরেকটা ব্যপার। যে শব্দটা ব্যবহার করা হচ্ছে তা হলঃ

وَإِذْ تَأَذَّنَ

আরবিতে ঘোষণা করার জন্য অনেকগুলো শব্দ আছে। আ’লানা বলা যেত, আখবারা বলা যেত। আরও কত শব্দ ব্যবহার করা যেত। إِذْ تَأَذَّنَ এসেছে الأذن (উযন) থেকে যার অর্থ – কান। এটা এমন একটা ঘোষণা যা আপনার কানে সবসময় বাজতে থাকে। আপনি এর ব্যপারে সবসময় ভাবতে থাকেন। কঠিন ঘোষণা। আপনারা মনে করতে পারবেন, অনেক সময় আপনাদের বাবা-মা আপনাদেরকে চিৎকার করে অনেক কিছুই বলে, কিন্তু মাঝে মাঝে তারা এমন কিছু বলে যে তা আপনার মনের মধ্যে গেথে যায়। আপনি কখনও যদি একা থাকেন এবং চোখ বন্ধ করেন, তখন আপনার সেই কথাগুলো মনে পড়ে। এটাই হচ্ছে – أَذَّنَ

আপনি এটা ভুলতে পারেন না। আল্লাহ বলছেন যে তিনি সবচেয়ে কঠিন ভাবে বলেছেন। তিনি সবচেয়ে হৃদয় বিদীর্ণ করে এই কথাগুলো বলেছেন।

لَئِن شَكَرْتُمْ

শাকারতুম হচ্ছে অতীত। যদি তোমরা একটুও কৃতজ্ঞ হতে। তোমরা যদি একবারও কৃতজ্ঞ হতে। একবারও যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। তোমরা যদি এতটুকুও করতে পারতে। তাহলে সেই একটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য –

لَأَزِيدَنَّكُمْ

আমি শপথ করছি যে আমি তোমাদেরকে বাড়িয়ে দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো। আল্লাহ এই আয়াতে ভাষা গত ভাবে তিনবার শপথ করেছেন।

তিনি শপথ করছেন যে তিনি বাড়িয়ে দিবেন যদি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাদেরকে শুধুই কৃতজ্ঞ হতে হবে। ব্যস, তাদের শুধু এতটুকুই করতে হবে। আমি শুধু এইটুকুই তোমাদের কাছ থেকে আশা করি। আমি আশা করছিনা যে তোমাদেরকে সবসময় কৃতজ্ঞ হতে হবে। তোমরা শুধু একবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। “তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর” – এর পরে আয়াতটি বর্তমান কালে চলে যায়, “আমি তোমাদের জন্য বাড়িয়ে দিতে থাকবোই” যা এটাই নির্দেশ করে যে তা সবসময় হতে থাকবে।

আরেকটা লক্ষণীয় ব্যপার যে আয়াতটি শুরু হয়েছিল তৃতীয় পুরুষে।

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ

এটা কিন্তু “তা আযযান্তুম” নয়। আল্লাহ কিন্তু বলেননি যে যখন আমি তোমাদেরকে ঘোষণা করেছিলাম। তিনি বলেছেন, যখন তোমাদের “প্রভু” ঘোষণা করেছিলেন। সেটা তৃতীয় পুরুষ। কিন্তু সাথে সাথেই তিনি তাদের নিকটে আসলেন, এবং বললেন, যদি “তোমরা” কৃতজ্ঞ হও তবে “আমি”বাড়িয়ে দিব। তিনি বলছেন না যে “তিনি” বাড়িয়ে দিবেন। আয়াতের বাকিটুকু কিন্তু হওয়া উচিত “তিনি”। কিন্তু আল্লাহ বলছেন যে যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে “আমি” তোমাদের নিকটবর্তী হব। তোমরা আমার নিকট সান্নিধ্য পাবে শুধুই কৃতজ্ঞ হয়ে। এটাই এই আয়াতের মাহাত্ত। সুবহান আল্লাহ। এই আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে তিনি আমাদের নিকটবর্তী হবেন, তিনি শুধু আমাদের কাছ থেকে এটাই চেন যে আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ হই।

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

ভাষা অলঙ্কারশাস্ত্র দিক থেকে আরও উল্লেখযোগ্য ব্যপার হল, যখন আপনি বলেন শাকারা, আপনি কার প্রতি কৃতজ্ঞ? আমরা সাধারনত বলি, থ্যাঙ্ক ইউ। আপনাকে ধন্যবাদ। আমরা “আপনাকে” শব্দটা যোগ করি। আমরা আল্লাহকে ধন্যবাদ দেই। আল্লাহ কিন্তু বলেননি লা-ইনশাকারতুম লি – “যদি তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, আমি বাড়িয়ে দিব”। তিনি বলেছেন, শুধুই কৃতজ্ঞ মনোভাব তৈরি কর। এটা শুধুই আল্লাহর প্রতি সীমাবদ্ধ নয়। কারণ নবী (সা) আমাদেরকে শিখিয়েছেন এবং কুরআন শেখায় – আমাদের শুধুই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হলে হবেনা, আমাদের শিক্ষক, আমাদের বাবা-মা, যেই আমাদের জন্য ভালো কিছু করছে তার প্রতিই কৃতজ্ঞ হতে হবে। কারণ আপনি যখন আপনার প্রতি ভালো কিছু হবার জন্য কৃতজ্ঞ হন, সেটা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াকেই বোঝায়। এটা আপনার রিজকের একটি অংশ। তাই আপনি যদি আপনার স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে না পারেন, যদি আপনার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে না পারেন, যদি আপনার সন্তান্দের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে না পারেন, যদি আপনার যে চাকরি বা ব্যবসা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ না হয়ে যে চাকরি বা ব্যবসা আপনি চান তা নিয়ে আফসোস করেন, আপনার যে গাড়ি আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ না হয়ে যে গাড়ি আপনি চান তার জন্য আফসোস করেন, যখন আপনি এসবের জন্য কৃতজ্ঞ হতে পারেন না, তখন আপনি আসলে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারেন না। লা-ইন শাকারতুম – সবকিছুর ব্যপারে। আপনাকে কৃতজ্ঞ হতে হবে সব কিছুর প্রতি, সবার প্রতি। এটা শুধু কোন একটি ব্যপারে সীমাবদ্ধ নয়। আর আপনি যদি সেটা করতে পারেন, আল্লাহ আপনাকে দিতেই থাকবেন, দিতেই থাকবেন, দিতেই থাকবেন। আর আল্লাহ যখন শপথ করেন তখন আর কে তার সাথে তুলনা করতে পারে? যখন তিনি সেই গ্যারেন্টি দেন, لَأَزِيدَنَّكُمْএটা স্বয়ং আল্লাহর কথা। আল্লাহর কোন কিছুর জন্য শপথ করার কিন্তু দরকারই নেই।

আপনি জানেন সাধারণ ভাষায় কেউ যখন কোন শপথ করে – আমি শপথ করছি আমি এটা করব, আমি শপথ করছি আমি ওটা করব না, কেউ যখন এরকম করে তার মানে তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। আপনি যখন দেরি করে অফিসে পৌঁছান, আপনি বলেন, “আমি সত্যি বলছি! রাস্তায় অনেক ট্রাফিক ছিল”। কারণ আপনি জানেন আপনাকে কেউ বিশ্বাস করবে না। একারনে আপনি শপথ করতে রাজি, কোর্টে গিয়ে হাজিরা দিতেও রাজি। শপথ তখনি করা হয় যখন আপনাকে কেউ বিশ্বাস করছেনা। আল্লাহ এখানে একটি বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী কে উদ্দেশ্য করে বলছেন। তিনি বনী ইসরাইলিদেরকে বলছেন। এখানে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু তারপরেও তিনি এমন করে বলছেন যেন এর মধ্যে শয়তানের কুমন্ত্রণা রয়েছে। যেন তারা পরে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে কৃতজ্ঞ হতে ভুলে যাবে। একারনেই তিনি কঠিনতম ভাষা ব্যবহার করে বলছেন যে, “আমি তোমাদেরকে বাড়িয়ে দিবই। আমি তোমাদেরকে দেখে রাখব, আমার উপর ভরসা রাখ। কৃতজ্ঞ হও। আমি তোমাদের খেয়াল রাখব”।

এখন শেষ কথাটা বলি। আমি এটা আগে বাদ দিয়ে গেছি। সামনে যাবার আগে বলে নেই। আমি আবার অতীতে যাচ্ছি। মুসা (আ) কে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন, ইন্না ফি যালিকা – “এভাবে তুমি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে”। আল্লাহ বলেনঃ

“তাদেরকে মনে করিয়ে দাও আল্লাহর দিনগুলোর কথা।”

মুসা(আ) কে যে নির্দেশগুলো দেওয়া হয়েছিল, তার একটা হল, কিভাবে তুমি তোমার লোকদেরকে কৃতজ্ঞ হওয়াবে। তাদেরকে মনে করিয়ে দাও “আল্লাহর দিনগুলোর” কথা। এখন এটা আবার কি – “আল্লাহর দিন”? জানেন, একটা সুরা আছে শুধুই “আল্লাহ দিন” নিয়ে। সুরাতুল আ’রাফ। সেই সুরায় আমরা অনেক “আল্লাহ দিন” এর উল্লেখ পাই। যেদিন আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। যে দিন আমাদেরকে এই পৃথিবীতে আনা হয়েছে। যে দিন আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে শপথ নিয়েছিলেন। যে দিন আমরা আল্লাহর কাছে ফেরত যাব। যে দিনগুলোতে আল্লাহ বিভিন্ন জাতিকে সাবধান করেছিলেন, যে দিনগুলোতে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করেছিলেন। এমনকি আমাদের প্রত্যেকেরই “আল্লাহর দিন” রয়েছে। বিশেষ কিছু দিন, যেদিনগুলোকে আল্লাহ আপনাকে কোন বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন, যা আপনি অন্য কোনভাবেই অন্য কারও কাছ থেকে আশা করেন নি, কিন্তু আল্লাহ আপনার জন্য সেটা করেছিলেন।

বনী ইসরাইলের জন্য “আল্লাহর দিন” ছিল সেদিন যেদিন আল্লাহ তাদেরকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই আল্লাহ এর আগের আয়াতে মুসা(আ) কে বলেছেন, “তাদেরকে মনে করিয়ে দাও আল্লাহর দিনগুলির কথা”। এর পরের আয়াতে মুসা(আ) আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করে বলছেন, “মনে পরে সেই দিনের কথা যেদিন আল্লাহ তোমাদেরকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন?” মনে পরে সেই দিনের কথা?

আল্লাহ তাকে যা শিখিয়েছেন তাই তিনি প্রয়োগ করছেন। আমরা এখানে কি শিখছি? আল্লাহ আমাদেরকে যা শিখিয়েছেন তা আমাদের প্রয়োগ করা উচিৎ। মনে পরে সেই দিনের কথা যেদিন আপনি হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন? মনে পরে সে দিনের কথা যেদিন বাচ্চা জন্ম হয়েছিল কোন সমস্যা ছাড়া? মনে পরে সেই দিনগুলোর কথা? কেউ সেই দিনগুলোর জন্য কৃতিত্ব পাবেনা, আল্লাহ ছাড়া। আমাদেরকে সেই দিনগুলোর কথা মনে রাখতে হবে এবং সেই দিনগুলোতে উৎসব করতে হবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে। প্রতি বছর সেই দিনগুলো আমাদের আল্লাহর প্রতি আরও কৃতজ্ঞ হবার উপলক্ষ হওয়া উচিৎ। আমার অনেক বন্ধু আছে যারা বহু বছর চেষ্টা করার পরে বাচ্চা হয়েছে আর তাও হয়েছে তিন মাস আগে। বাচ্চাগুলকে ICU তে তিন চার মাস রাখা হয়েছে। হয়ত এই ঘটনা ঘটেছে ১০ বছর আগে। কিন্তু এখন বাচ্চাগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ সাধারণ জীবন যাপন করছে। প্রতি বছর বাবা-মারা এই বাচ্চাগুলোকে দেখে এবং তাদের কৃতজ্ঞতা আরও বেড়ে যায় কারণ তাদের বাচ্চার বেঁচে থাকাটা অসম্ভব ছিল। ডাক্তাররা আশা ছেড়েই দিয়েছিল। তারা বাবা-মাকে মানসিক প্রস্তুতি নিতে বলেছিল। হাসপাতালের নার্সরা তাদেরকে সান্ত্বনা দেবার জন্য প্রস্তুত ছিল সন্তান হারাবার দুঃখ সামাল দেবার জন্য। সবকিছুই তৈরি ছিল সেই দুর্ঘটনার জন্য। কিন্তু আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন – না। এই বাচ্চাটি বেঁচে থাকবে এবং সে তার বাবা-মার জন্য আনন্দের উৎস হবে। সুবহান আল্লাহ।

আমাদেরকে শিখতে হবে কিভাবে কৃতজ্ঞ জাতি হতে হয়। যদি বনী ইসরাইলদেরকে এত কষ্টের মধ্যেও এই শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের কমপ্লেইন করার কোন সুযোগই নেই। আর এই শিক্ষাটা দেওয়া হচ্ছে মুসা(আ) কে, যা কিনা আমাদের জন্য আরেকটা বড় উপলব্ধির বিষয়। আমাদের নবী (সা) ছাড়া আর কোন নবীর যদি কমপ্লেইন করার অধিকার থাকে, তাহলে তিনি হলেন মুসা(আ)। তার কমপ্লেইন করার অধিকার আছে। এটা এজন্য নয় যে তিনি তার কাফের শত্রুদের কাছ থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। বরং তিনি তার বিশ্বাসী অনুসারীদের কাছ থেকেও যথেষ্ট যন্ত্রণা পেয়েছিলেন। এতটাই যন্ত্রণা যে তার মুখ থেকে বের হয়েছিল, নি’মাতু উযুনানি। কেন তোমরা আমাকে যন্ত্রণা দাও? কেন তোমরা আমাকে ক্রমাগত কষ্ট দাও? তোমরাতো জানো যে আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর রাসুল । তারপরেও তোমরা কেন আমাকে যন্ত্রণা দাও?

যদি কোন নবী থাকে যার কমপ্লেইন করার অধিকার আছে, তবে তিনি হচ্ছেন মুসা (আ)।

এখন আল্লাহ কি বলছেন এই সুরার শেষে তার নবীকে যাতে করে তিনি তার লোকদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারেন?

দুটো গুণ। তিনি বলছেন, এই বাণী যেকোনো মানুষের উপকারে আসবে যদি তাদের দুটো গুণ থাকে। যারা এই বাণী থেকে সববেশি লাভবান হবে তাদের দুটো গুণ থাকতে হবে। তারা হল সাব্বা-র এবং তারা হল শাকু-র। আমি এ দুটি আপনাদের জন্য অনুবাদ করি। একটি হল – অত্যন্ত ধৈর্যশীল, সবসময় ধৈর্যশীল, বার বার তারা ধৈর্য ধরে। দ্বিতীয়টি হল – অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। এই দুটিই hyperbolized noun. অত্যন্ত ধৈর্যশীল, অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আপনি যদি এই দুটো করতে পারেন, তাহলে আপনার মত আর কেউ আল্লাহর বাণী থেকে উপকৃত হতে পারবেনা। কিন্তু কেন এই দুটো জিনিস একসাথে? আমি আপনাকে একটা সহজ উদাহরণ দেই। আমি এর আগেও বহুবার বলেছি, কিন্তু আবারও বলি।

আপনি ফ্রিজ খুললেন। আপনি চার পাঁচ ধরনের পানীয় দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু একটা পানীয় যেটা আপনি চাচ্ছিলেন – পেপসি, সেটা নেই। বাকি সবই আছে। দুধ, দই, আপেল জুস, বেলের শরবত সবই আছে, কিন্তু পেপসি নেই।

“আরে ধুর! পেপসি কই?”

আপনি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন, কারন আপনার যা কিছু আছে তার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ নন। প্রথমেই আল্লাহ তাদেরকে ধৈর্যের কথা বলছেন কারণ তারা একটা কঠিন অবস্থার মধ্যে আছে। কিন্তু কি আছে যা আপনার ধৈর্য ধরাকে সহজ করে দিবে? অনেকে আমাকে জিগ্যেস করে, “ভাই, আমি কিভাবে ধৈর্যশীল হতে পারি? আমার মাথা গরম। আমি অনেক রেগে যাই, অধৈর্য হয়ে যাই, নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনা। ” আপনি পারবেন। আপনি কৃতজ্ঞ হবার চেষ্টা করেন। এটা কুরআনের শিক্ষা। আপনি যদি আপনার অধৈর্য হওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান তাহলে কৃতজ্ঞ হওয়া শিখেন। কারণ আপনি যদি আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছে তা নিয়ে সবসময় চিন্তা করে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে আপনার মন সময় পাবেনা চিন্তা করে দেখার আপনি আপনার মত করে কি কি পান নি জীবনে। আপনি আপনার মত করে যা পেতে চান, সেটা হচ্ছে আপনার চাওয়া পাওয়া। কিন্তু আপনি যা ইতিমধ্যে পেয়েছেন সেগুলো হচ্ছে আল্লাহ আপনার জন্য যা চেয়েছেন। দুটোর মধ্যে পার্থক্য কি চিন্তা করে দেখুন। আমি আবার বলছি। আপনি যা চান সেটা হছে আপনার হৃদয় থেকে। “আমি ওই গাড়িটা চাই। আমি ওই বাড়িটা চাই। আমি চাই আমার ছেলে অমুক হোক, আমার মেয়ে অমুক করুক। আমি চাই তুমি এটা কর, সে ওটা করুক”। কিন্তু আপনি এই মুহূর্তে যা পেয়েছেন, তা পেয়েছেন কারণ আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি আপনাকে তা দিবেন। আপনি তুলনা করছেন “আপনি যা চান” তার সাথে “আল্লাহ আপনার জন্য যা চেয়েছেন” তাকে। আমাদেরকে শিখতে হবে কি করে কৃতজ্ঞ হতে হবে। আমি বলছি না যে আমরা আরও ভালো কিছু পাবার জন্য কোন চেষ্টা করব না। আমাদেরকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে ধৈর্যের সাথে, এবং কৃতজ্ঞতার সাথে। আর আপনি যদি আপনার অবস্থার উন্নতি করতে চান, তাহলে আয়াতটিতে সমাধান রয়েছে।

“ভাই, আমার পরিবারের অবস্থার কোন উন্নতি তো হচ্ছে না। আমার বেতন তো বাড়ছে না। আমার ঋণ তো শোধ হচ্ছে না। আমার সমস্যাগুলোর তো সমাধান হচ্ছে না”। আল্লাহ এখানে আমাদেরকে ফর্মুলা বলে দিয়েছেন।

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُم

তুমি যদি কৃতজ্ঞ হও, আমি তোমাকে দিব।

আপনি কি মনে করেন? কোথা থেকে আপনার টাকা আসে? কোথা থেকে আপনার সমস্যার সমাধান আসে? সেটা আল্লাহর কাছ থেকে আসে। তিনি বলছেন আমি তা আটকে রেখেছি যতক্ষন না তুমি কিছুটা কৃতজ্ঞতা দেখাও। তুমি কৃতজ্ঞতা দেখাও, আমি তা তোমাকে দিয়ে দিব। তুমি কিসের জন্য অপেক্ষা করছ? কৃতজ্ঞ হওয়া শিখো!

তারপর তিনি আরেকটি কথা যোগ করেন এবং আমি তা দিয়ে শেষ করব।

… এবং তুমি যদি কৃতজ্ঞ না হও, তুমি যদি অস্বীকার কর যে এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার, তুমি যদি তোমার সব মনোযোগ দাও তোমার জীবনের সমস্যাগুলোর দিকে, সবসময় কমপ্লেইন কর নিজের প্রতি এবং অন্যের প্রতি, যদি এরকমই একটা জীবন তুমি পার করতে চাও, আমার শাস্তি কিন্তু খুবই কঠিন।

এই আয়াতটির একটা অসাধারণ ব্যপার হল, তিনি কিন্তু বলছেন না যে “যদি তুমি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে আমি তোমাকে শাস্তি দিব”। আল্লাহ কিন্তু তা বলছেন না। তিনি “তোমাকে” শব্দটা পর্যন্ত উল্লেখ করছেন না। তিনি শুধুই বলছেন, “আমার শাস্তি খুব কঠিন”। মনে আছে? যখন কেউ কৃতজ্ঞ হয়, তখন তিনি তার কোথা উল্লেখ করেন।

لَأَزِيدَنَّكُمْ

“আমি বাড়িয়ে দিব তোমাকে”। তিনি আমাকে এবং আপনাকে সন্মান দেখিয়েছেন “আমাদেরকে” উল্লেখ করে। কিন্তু যে অকৃতজ্ঞ, সে আল্লাহর কাছে উল্লেখ করার মত যোগ্যতাও রাখেনা। তিনি শুধুই বলেন, “আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন”। তুমি উল্লেখ করার মত কেউ নও। তুমি আমাকে মনে কর না, আমি তোমাকে মনে করব কেন? আল্লাহ এটাই বলছেন এই আয়াতে।

“আমার শাস্তি খুবই কঠিন”!

আপনারা দেখবেন, বনী ইসরাইলিরা এমন ভাব করতো যা আজকাল আপনারা মুসলমানদের মধ্যেও দেখতে পাবেন। “আল্লাহ আমাদের প্রতি এমন করবেন না। আমরা স্পেশাল। তিনি আমাদেরকে নদীর ভেতর থেকে বের করে এনেছেন কি আমাদেরকে শাস্তি দেবার জন্য? কি বল! আর যাই হোক, তিনি আমাদেরকে এতদুর পর্যন্ত যখন এনেছেন, তিনি আমাদেরকে রক্ষা করবেন, কারণ আমরা স্পেশাল। তিনি আমাদেরকে শাস্তি দিবেন না। যাহ, কি বলছ তোমরা! আমরা হচ্ছি মুসার উম্মাহ! (আ)”।

কথাগুলো পরিচিত মনে হচ্ছে?

এর পরের আয়াতটি কি বলছে? আমি এটা বলেই শেষ করব। কারণ আমরা যাতে বাস্তবতাটা উপলব্ধি করতে পারি।

মুসা (আ) তার জাতিকে বলছেন।

যদি তোমরা সবাই অকৃতজ্ঞ হয়ে যাও, এবং পৃথিবীর সবাই যদি অকৃতজ্ঞ হয়েও যায়।

তারপরেও আল্লাহ সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষি। তোমাদেরকে তাঁর কোনই দরকার নেই । তোমরা যেন এক সেকেন্ডের জন্যও মনে না কর যে তোমরা স্পেশাল।

তোমরা স্পেশাল নও। আল্লাহ হচ্ছেন গা’নি। তার কোনই প্রয়োজন নেই যে তোমরা তার প্রশংসা কর। তিনি ইতিমধ্যেই স্বপ্রশংসিত – হামিদ। তিনি বলছেনও না যে তিনি মাহমুদ।

মাহমুদ হচ্ছে একজন যাকে প্রশংসা করা হচ্ছে। যার মানে দাঁড়ায় যে – কেউ আছে যে তার প্রশংসা করছে। হামিদ অন্য কারো উল্লেখও করে না। তিনি প্রশংসিত নিজে থেকেই, এমনকি কারো অস্তিত্বও যদি না থাকে। আপনি কি মনে করেন যে তার আপনাকে প্রয়োজন তার প্রশংসা করার জন্য? তার আপনাকে কোন দরকার নেই। এটা শুধুই আপনার জন্য, যাতে করে আপনি আরও বেশি পেতে পারেন। এই শিক্ষাটি আল্লাহ মুসা (আ) কে দিয়েছিলেন যাতে করে তিনি তার জাতিকে শেখাতে পারেন, যাতে করে তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসতে পারে। আর এই শিক্ষাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে আল্লাহ এটাকে স্বয়ং নবী (সা) এর শিক্ষার জন্য রেখেছেন। এটা নবী (স) এর জন্য শিক্ষাদানের পদ্ধতি। তাকে বলা হয়েছিল তার জাতিকে অন্ধকার থেকে বের করে আনতে এবং তাকে দেখান হচ্ছে কিভাবে মুসা (আ) তা করেছিলেন। “মুসা(আ) তার জাতিকে এভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং তুমি তোমার জাতিকেও এভাবে মনে করিয়ে দাও”।

আল্লাহ আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসার সামর্থ্য দিন, আল্লাহ আমাদেরকে কৃতজ্ঞ জাতি হবার সামর্থ্য দিন, আল্লাহ আমাদেরকে জীবনের ভালো পাওয়াগুলোর দিকে মনোযোগ দেবার সামর্থ্য দিন এবং তার প্রতি একান্তভাবে সত্যিকারের কৃতজ্ঞ হবার সামর্থ্য দিন, এবং আমাদের কৃতজ্ঞতার ফলাফল হিসেবে আল্লাহ আমাদেরকে আরও অনেক ভালো কিছু দিন, আমাদেরকে পথ দেখান এবং অনেক বরকত দিন এই দুনিয়াতে।

Print Friendly

About ওমর আল জাবির

কু'রআনকে গভীরভাবে ভালবাসি। সত্যকে জেনে, তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে অন্যদেরকে অনুপ্রেরণা দেবার চেষ্টা করি।
This entry was posted in উপলব্ধি, কু'রআন. Bookmark the permalink.

3 Responses to আমরা কেন কৃতজ্ঞ হই না

  1. Ishtiaque Hussain says:

    আমি YouTube -এ লেকচার টা শুনে শুনে আপনার অনুবাদ টা পড়লাম। খুবই ভালো অনুবাদ হয়েছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, অনুমতি নিয়ে বাংলায় ডাবিং করতে পারলে মনে হয় আরো ভাল হত। লেকচার’র আবেগটা তখন আরো জোড়ালো হতো। আমাদের অনেকরই তো পড়তে ভাল লাগে না!

    ছোট্ট একটা observation, “অরেঞ্জ জুস” কে “পেপসি” অনুবাদ করেছেন 24:42-a।
    বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে হয়তো ওইটাই বেশী উপযুক্ত। 🙂

  2. Tonima says:

    আন্তরিক সাধুবাদ আর অকৃএিম কৃতজ্ঞ্তা…

  3. obaydullah says:

    #ভাই এই অনুবাদ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। আল্লাহ তা,লা আপনাকে উত্তম জাঝা দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *